লেখক : কাজী আনোয়ার হোসেন
প্রকাশনী : সেবা প্রকাশনী
বইয়ের নাম্বার :
প্রকাশকাল :

ধ্বংস পাহাড়


 মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই

মাসুদ রানা’র প্রথম বইটি কাজী আনোয়ার হোসেনের ১০ মাসের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল। তিনি ঐ সময়ে মোটরসাইকেলে তাঁর রাঙ্গামাটি ভ্রমণের কথা স্মরণ করে লেখেন উপন্যাসটি। আর ঐ কাহিনীই বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কারণ মাসুদ রানাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম চরিত্র যা বাংলাদেশের চরিত্র হলেও একটি বৈশ্বিক চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।


কফির কাপটা মুখে তুলতে গিয়ে থমকে গেলেন চীফ এঞ্জিনিয়ার আর.টি. লারসেন। সামনে দাঁড়ানো লোকটার মুখের দিকে চাইলেন ভুরু কুঁচকে। তারপর ভাঙা বাংলায় বললেন, “বলো কি, আবদুল! এটা সম্ভব?”

ফ্ৰন্টিয়ারের আবদুর রহমান উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘হামি নিজে তিন দিন দেখছি, স্যার। কেউ হামার কোথা বিশওয়াস কোরে না। আখুন আপনার কাছে আইছি হাজুর, কসম খোদার…’

“আমাকে দেখাতে পারবে?” ওকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লারসেন।
“আলবৎ! আর আধা ঘোণ্টা পর আইবো তারা। উও স্পীডবোট হামাদের না, ফিশারীরও না। আজহি দেখাতে পারি, হাজুর!”
“বেশ, তুমি যাও। ঠিক সাতটায় আসছি আমি ড্যামের ওপর।”
খুশিমনে সাহেবের বাংলো থেকে বেরিয়ে এল আবদুর রহমান। একবার ভাবল, আজ যদি ওরা না আসে? বোকা বনতে হবে সাহেবের কাছে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে মনে মনে বলল-রোজ আসছে, আজ আসবে না কেন, নিশ্চয়ই আসবে।
কাপ্তাই বাঁধের কাজ শেষ, পাওয়ার হাউজ তৈরির শেষ পর্বের কাজ চলছে জোরেশোরে। তুমুল ব্যস্ততা, চারদিকে সাজ-সাজ রব, প্রেসিডেন্ট আসবেন ড্যাম ওপেন করতে। এরই মধ্যে এই ফ্যাঁকড়া।
আজ আট বছর ধরে প্রজেক্টের সারভে ডিপার্টমেন্টে কাজ করছে আবদুর রহমান।
কাপ্তাইকে সে ভালবেসে ফেলেছে সমস্ত হৃদয় দিয়ে। ওর চোখের সামনেই তিল তিল করে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে এই বাঁধ। প্রজেক্টের খুঁটিনাটি ওর নখদর্পণে। ড্যামের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলের দিকে লক্ষ রাখার গুরু দায়িত্ব ওর ধারণা ওরই উপর ন্যস্ত আছে। সীমান্ত প্রদেশের আবদুর রহমান এখানে এসে সবার প্রিয় আবদুল হয়ে গেছে। সাহেব সুবোরা স্পীড বোটে করে বেড়াবেন, কি পাহাড়ী গ্রাম দেখতে যাবেন, কিংবা ষাট মাইল উত্তরে যাবেন হরিণ শিকারে, সঙ্গে যাবে কে-ওই আবদুল। সবকিছুতেই ওর অক্লান্ত উৎসাহ। এই পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথায় সে যায়নি? চল্লিশ মাইল পায়ে হেঁটে দুর্গম হিলেও গিয়েছে সে সাহেবদের সঙ্গে।
ক’দিন ধরে একটা ব্যাপার লক্ষ করে বড় উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে আবদুল ভিতর ভিতর। আর দু‘দিন পর প্রেসিডেন্ট আসছেন প্রজেক্ট ওপেন করতে। ছোট্ট শহরটায় তাই অস্বাভাবিক চাঞ্চল্য। চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গিয়েছে। প্রচুর আই.বি., সি.আই.ডি. ঘুরঘুর করছে শহরের আনাচেকানাচে। কিন্তু আই.বি. কর্মতৎপরতা বলে এই ঘটনাকে হালকা করে দেখতে পারেনি সে। তাই যদি হয় তবে ভুড়ভুড়ি কিসের?
এক টিপ খইনি নিচের ঠোঁট আর দাঁতের ফাঁকে যত্নের সাথে ছেড়ে দিয়ে সেটাকে ঠিক জায়গামত বসিয়ে নিল আবদুল। তারপর স্পিলওয়ের গার্ডরূমে ঢুকে দোনলা বন্দুকধারী দেশোয়ালী ভাইয়ের সাথে অনর্গল পশতু ভাষায় কিছুক্ষণ বাতচিত করল।
ঠিক সাতটার দূর থেকে লারসেন সাহেবকে আসতে দেখে এগিয়ে গেল আবদুর। সন্ধ্যার আর দেরি নেই।
কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর রিজারভয়েরের মধ্যে দূরে একটা স্পীড-বোট দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন মি. লারসেন। উঁচু একটা টিলার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। আরও আধ ঘণ্টা পর আবদুলের কথামত সত্যিই পানির উপরে ছোট ছোট বুদ্বুদ দেখা গেল। শক্তিশালী টর্চ জ্বেলে দেখা গেল সেই টিলার দিক থেকে বুদ্বুদের একটা রেখা ক্রমেই এগিয়ে আসছে বাঁধের দিকে। গজ পনেরো থাকতে এগোনোটা থেমে গেল-এবার এক জায়গাতেই উঠতে থাকল বুদ্বুদ।
মি. লারসেন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মাই গড! আশ্চর্য! আবদুল, তুমি ছুটে যাও তো, স্টোর থেকে আমার নাম করে দুটো অ্যাকুয়া-লাঙ (ডুবুরীর পোশাক) নিয়ে এসো এক্ষুণি। আর যাওয়ার পথে লোকমানকে বলে যাও আমাদের স্পীড-বোট রেডি করে ঘর থেকে যেন আমার রাইফেলটা নিয়ে আসে। যাও, কুইক।’

দৌড় দিল আবদুল। ঠিক সেই সময়ে দূর থেকে একটা এঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার শব্দ শোনা গেল। সেই টিলার দিক থেকেই এল শব্দটা। ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল সেই শব্দ-ফিরে চলে গেল স্পীড-বোট।

***
কাপ্তাইয়ের পাঁচ মাইল উত্তর-পশ্চিমে হাতের বামদিকে একটা মাটির টিলা-এখন রিজারভয়েরের পানি বেড়ে ওঠায় ডুবু-ডুবু। তারই ভিতর দামী আসবাবপত্রে সুসজ্জিত একটা প্রশস্ত ঘর। একটা সোফায় বসে আছেন গৃহস্বামী কবীর চৌধুরী আর অপর একখানায় ভারতীয় গুপ্তচর বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ মাদ্রাজী কর্মকর্তা মি. গোবিন্দ রাজলু। পাশের টিপয়ের উপর চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে গোবিন্দ রাজলু বলল, ‘অসামান্য প্রতিভা আপনার, মি. চৌধুরী। এই পাহাড়ের মধ্যে এত বড় একটা গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করলেন কি করে? এতসব যন্ত্রপাতি, এত রকম ব্যবস্থা! অথচ বাইরে থেকে কিছুই বুঝবার উপায় নেই।”
এই অকুণ্ঠ প্রশংসায় কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার চাইল রাজলুর চোখের দিকে, তারপর বলল, “আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি, মি. রাজলু। শুক্রবারেই ঘটবে ঘটনাটা।”
দেয়ালের গায়ে দুটো তাকের উপর থরে থরে সাজানো আছে বই। চৌধুরী উঠে গিয়ে একটা বোতাম টিপতেই দেয়ালের খানিকটা অংশ ঘুরে গেল। বইসুদ্ধ সামনের দিকটা অদৃশ্য হয়ে গেল পিছনে, আর পিছন দিক থেকে সামনে চলে এল একটা সি-সি টিভি, অর্থাৎ ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন সেট। সেটটা চালু করে দিয়ে নিজের আসনে গিয়ে বসল চৌধুরী। গোবিন্দ রাজলু অবাক হয়ে দেখল পরিষ্কার কাপ্তাই ড্যামের ছবি দেখা যাচ্ছে টেলিভিশনে। এক আধটা গাড়ি সাঁ করে চলে যাচ্ছে বাঁধের ওপরের রাস্তাটা দিয়ে। সামনে থৈ-থৈ করছে জল, অল্প বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে সে জলে।
‘রিজারভয়েরের জল এখন কতখানি?’ জিজ্ঞেস করল রাজলু।
‘সী-লেভেল থেকে ৯৯ ফুট। এটা সারভে অভ পাকিস্তানের হিসাব। ড্যামের হিসেব অবশ্য আলাদা-ওরা লেভেলের নয় ফুট নিচ থেকে ধরে। ওরা বলবে এখন ১০৮ ফুট।’
‘আচ্ছা, পুরো ড্যামের ফিল্ ম্যাটেরিয়াল কতখানি? মাত্র তিনটেতেই কাজ হয়ে যাবে বলে মনে করেন?’
‘ফিল্ ম্যাটেরিয়াল হচ্ছে পনেরো কোটি ছেষট্টি লক্ষ আশি হাজার সি.এফ.এস.। হ্যাঁ, আমার মতে তিনটেই যথেষ্ট। মেইন ড্যামটা দু’হাজার দুশো ফুট লম্বা; আর চওড়া হচ্ছে, ওপরটা বাইশ ফুট-নিচটা একশো পঁয়তাল্লিশ ফুট। তিনটে জায়গা ভেঙে দিতে পারলে বাকিটা আপনিই উঁড়ে যাবে। তাছাড়া দেখুন, স্পিলওয়ের ষোলোটা গেট-প্রতিটা বত্রিশ বাই চল্লিশ ফুট-আমার লোক সব ক’টা লক গেট সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে সরে পড়বে সবাই যখন প্রেসিডেন্টের ওপেনিং নিয়ে ব্যস্ত, সেই সুযোগে। এছাড়াও পাওয়ার হাউসের টানেল ডায়ামিটার হচ্ছে বত্ৰিশ ফুট হরসশ্যূ-সেখান দিয়েও বেরোচ্ছে পানি। সবটা মিলে মোট এফেক্ট হচ্ছে এক কথায় যাকে বলে ডিভাসটেটিং, ভয়ঙ্কর। পুরো রিজারভয়ের অর্থাৎ দু’শো তেপ্পান্ন বর্গমাইলের এতদিনকার জমা পানি একসাথে বেরোবার চেষ্টা করছে-কল্পনা করুন একবার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, মি. রাজলু, এই তোড়ের মুখে প্রেসিডেন্টের চিহ্নমাত্রও খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাক্-চীন প্যাক্ট নিয়েও ভারতকে আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে না।’
‘আমাকে আপনি আশ্চর্য করে দিচ্ছেন, মি. চৌধুরী। ভয়ানক নিষ্ঠুর লোক আপনি, মশাই! এত সাঙ্ঘাতিক একটা কাজ এমন ঠাণ্ডা মাথায় কি করে করছেন আপনি? এতটুকু বিকার নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে একবারও কি দ্বিধা হচ্ছে না, কিংবা হচ্ছে না একবিন্দু বিবেক-দংশন?’
‘দেখুন, সে অনেক কথা। আমাদের কারও হাতেই অত সময় নেই যে এ নিয়ে আলাপ করব। তবু এটুকু আপনাকে বলতে পারি যে এমন হঠাৎ করে যদি প্রয়োজন হয়ে না পড়ত তাহলে হয়তো এত প্ৰাণ নষ্ট না করে অন্য উপায় অবলম্বন করতাম আমি। কেবল মাত্র আকস্মিক প্রয়োজনের তাগিদেই আপনাদের সাহায্য নিতে হচ্ছে আমাকে-এবং কেবল মাত্র এই জন্যেই প্রজেক্ট ওপেনিং-এর দিন ড্যাম ভাঙার গৰ্হিত প্রস্তাব আমাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে হলো।’
কথার ফাঁকে ফাঁকে বাঁকা পাইপটায় টোবাকো ভরা হচ্ছিল, এবার সেটা ধরিয়ে নিয়ে টেলিভিশন সেটের একটা নব সামান্য ঘুরিয়ে ছবিটা আরও পরিষ্কার করে দিল মি. চৌধুরী। তারপরই কী দেখে চমকে উঠে ‘এক্সকিউজ মি,’ বলে একপাশে টেবিলের উপর রাখা ওয়ায়্যার-লেস্ ট্রান্সমিটারের সামনে গিয়ে বসল।
হঠাৎ চৌধুরীকে এমন ব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখে বিস্মিত গোবিন্দ রাজলু টেলিভিশনের দিকে চেয়ে দেখল তাতে একজন মার্কিন সাহেবকে দেখা যাচ্ছে। হাত নেড়ে কাউকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে সে-বাঁধের কাছেই জলের মধ্যে কিছু লক্ষ করছে সাহেব টর্চ জ্বেলে।
কানে এয়ার ফোন লাগিয়ে ইলেভেন মেগাসাইকেলসে সিগন্যাল দিল চৌধুরী।
‘এক্স ওয়াই জেড কলিং এস বি টু, ক্যান ইউ হিয়ার মি?’ দু’বার কথাটা বলল চৌধুরী।
‘এস বি টু স্পীকিং। হিয়ার ইউ লাউড অ্যাণ্ড ক্লিয়ার।’ সাথে সাথেই উত্তর এল স্পীড-বোট থেকে।
‘তেরো নম্বরকে বোটে ফিরিয়ে আনো-সিগনাল দাও।’
খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর উত্তর এল, ‘আমাদের সিগন্যাল পাচ্ছে না তেরো নম্বর-অনেক দূর চলে গেছে। এগিয়ে যাব সামনে?
একুমুহূর্ত চিন্তা করে চৌধুরী বলল, ‘না, ফিরে চলে এসো এক্ষুণি।’
চিন্তিত মুখে আবার কী-বোর্ডে কিছুক্ষণ আঙুল চালিয়ে বলল, ‘এক্স ওয়াই জেড কলিং কে পি ফাইভ, এক্স ওয়াই জেড…এক্স ওয়াই জেড….এক্স ওয়াই জেড। ক্যান ইউ হিয়ার মি?’ বার কয়েক কথাটা উচ্চারণ করল সে। তারপর উত্তর এল।
‘দিস ইজ কে পি ফাইভ। হিয়ার ইউ লাউড অ্যাণ্ড ক্লিয়ার, স্যার।’ কাপ্তাই ভি আই পি রেস্ট হাউসের একটা কামরায় ট্রান্সমিটারের সামনে বসে শুনছে কে পি ফাইভ।
‘ড্যামের গায়ে আনলাকি থারটিন কাজ করছে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ধরা পড়বে ও। তুমি গিয়ে পানিতে নামবে সবার আগে। যন্ত্রপাতি মাটি চাপা দিয়ে দেবে এবং তেরো নম্বরের মৃতদেহ নিয়ে ওপরে উঠবে। বুঝতে পেরেছ? তেরো যেন জ্যান্ত পানির ওপর না ওঠে।’
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


ডাউনলোড করুন

Post a Comment

Your email is never published nor shared. Required fields are marked *

*
*